অনেক দিন আগের কথা। এক নদীর ধারে ছিল ছোট্ট এক গ্রাম—নাম তার শালবন। গ্রামটি ছিল যেমন সুন্দর, তেমনি শান্ত। চারদিকে তালগাছ, বাঁশঝাড়, পুকুর আর ধানের মাঠ। সন্ধ্যা হলেই দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসত, আর রাত নামলে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যেত না।
কিন্তু গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় ছিল একটি পুরোনো বাড়ি।
বাড়িটির নাম ছিল শ্মশানবাড়ি।
নামটা শুনলেই গ্রামের মানুষ কেঁপে উঠত।
বাড়িটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত। দরজা-জানালা ভাঙা, উঠানে বুনো ঘাস, আর বাড়ির পেছনে বিশাল এক বটগাছ। লোকমুখে শোনা যেত, প্রতি অমাবস্যার রাতে সেই বটগাছের নিচে একটি নীল আলো জ্বলে ওঠে।
আর সেই আলো নাকি জোনাকি পোকার আলো নয়।
একদিন গ্রামের এক কিশোর ছিল—নাম রহিম। ছেলেটি ছিল ভীষণ সাহসী। ভূত-প্রেতের গল্প শুনে অন্যরা যখন কম্বলের নিচে মুখ লুকাত, রহিম তখন হেসে বলত,
—“ভূত বলে কিছু নেই! থাকলে একদিন ধরে এনে তোমাদের দেখাব!”
গ্রামের বুড়ো করিম চাচা তাকে সাবধান করে বলতেন,
—“বাপু, সবকিছু চোখে দেখা যায় না। শ্মশানবাড়ির ধারেকাছেও যাস না।”
রহিম হেসে বলত,
—“চাচা, ভূত যদি থাকে, সে আমাকে দেখেই ভয় পাবে!”
একদিন রাতে রহিমের মা তাকে বললেন,
—“বাবা, তোর নানির বাড়িতে এই ওষুধটা দিয়ে আয়। আজ রাতেই দিতে হবে।”
নানির বাড়ি যেতে হলে শ্মশানবাড়ির পাশের রাস্তা দিয়েই যেতে হয়।
রহিম হাতে কুপি নিয়ে রওনা হলো।
সেদিন ছিল অমাবস্যা।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
হঠাৎ—
ঝিক… ঝিক… ঝিক…
দূরে নীল আলো জ্বলে উঠল।
রহিম থমকে দাঁড়াল।
বটগাছের নিচে সত্যিই একটা নীল আলো!
সে নিজেকেই বলল,
—“জোনাকি হবে।”
কিন্তু আলোটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
ঝিক…
ঝিক…
ঝিক…
রহিমের বুক ধকধক করতে লাগল।
আলোটা কাছে এসে থেমে গেল।
তারপর অন্ধকারের মধ্যে থেকে ভেসে এল মিষ্টি একটা কণ্ঠ—
—“রহিম…”
রহিম চমকে উঠল।
—“কে?”
কোনো উত্তর নেই।
আবার ডাক এল—
—“রহিম… আমার একটা উপকার করবি?”
রহিম কাঁপা গলায় বলল,
—“কে তুমি?”
নীল আলোটা এবার একটু উজ্জ্বল হলো।
আলোর মধ্যে দেখা গেল সাদা পোশাক পরা এক বৃদ্ধা।
চুল তার কোমর ছাড়িয়ে গেছে।
বৃদ্ধা বললেন,
—“এই বাড়ির ভেতরে আমার একটা কাঠের বাক্স আছে। বাক্সটা এনে দে।”
রহিমের মনে হলো, এখান থেকে দৌড়ে পালানো উচিত।
কিন্তু তার কৌতূহল আরও বড়।
সে বলল,
—“বাক্সটা দিয়ে কী হবে?”
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
—“বাক্স খুললেই সব জানতে পারবি।”
রহিম বাড়ির ভাঙা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
কড়ররর…
দরজা খুলতেই ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে তার কুপি নিভিয়ে দিল।
অন্ধকার।
একেবারে অন্ধকার।
হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা শব্দ এল—
ঠক… ঠক… ঠক…
রহিম শব্দ অনুসরণ করে একটি ঘরে গেল।
সেখানে মেঝের ওপর পড়ে ছিল ছোট্ট একটি কাঠের বাক্স।
সে বাক্সটি হাতে নিতেই পেছন থেকে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ধাম!
রহিম দরজায় ধাক্কা দিল।
—“কে? দরজা খোলো!”
কোনো উত্তর নেই।
তারপর বাক্সের ভেতর থেকে শব্দ হলো—
খস… খস… খস…
রহিম বাক্সটি মাটিতে রেখে পিছিয়ে গেল।
বাক্সের ঢাকনা নিজে থেকেই একটু একটু করে খুলতে লাগল।
ভেতর থেকে বের হলো পুরোনো একটি চিঠি।
রহিম চিঠিটি হাতে তুলে নিল।
চিঠিতে লেখা—
“যে এই চিঠি পড়বে, সে যেন আমার মাটির নিচে রাখা শেষ আমানতটি গ্রামের গরিব মানুষদের দিয়ে দেয়।”
রহিম অবাক হয়ে গেল।
ঠিক তখনই পেছনে সেই বৃদ্ধার কণ্ঠ—
—“বাক্সটি পেয়েছিস?”
রহিম ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল।
বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু এবার তাঁর মুখে কোনো ভয়ংকর ভাব নেই।
তিনি বললেন,
—“আমি এই বাড়ির মালিকের স্ত্রী ছিলাম। বহু বছর আগে মারা গেছি। আমার স্বামী গ্রামের গরিবদের জন্য কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকার খবর কেউ জানত না।”
রহিম বলল,
—“তাহলে আমাকে কেন ডাকলে?”
বৃদ্ধা বললেন,
—“কারণ তুই ভয় পেলেও পালিয়ে যাসনি।”
পরদিন সকালে রহিম গ্রামের কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে সব ঘটনা বলল।
তারা শ্মশানবাড়ির উঠানে গিয়ে বটগাছের পাশে মাটি খুঁড়ল।
কিছুক্ষণ পর বের হলো একটি পুরোনো মাটির হাঁড়ি।
তার ভেতরে ছিল অনেক পুরোনো রুপার মুদ্রা।
গ্রামের মানুষ সেই সম্পদ বিক্রি করে একটি ছোট মাদ্রাসা, একটি পাঠাগার এবং দরিদ্রদের জন্য তহবিল তৈরি করল।
তারপর থেকে শ্মশানবাড়ির ভয় আর রইল না।
তবে রহিম বলত,
—“অমাবস্যার রাতে বটগাছের দিকে তাকালে এখনো মাঝে মাঝে নীল আলো দেখা যায়।”
একদিন করিম চাচা তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
—“ভূত দেখেছিলি?”
রহিম মুচকি হেসে বলল,
—“ভূত ছিল কি না জানি না। তবে সেদিন বুঝেছিলাম—সব অন্ধকারের ভেতর ভয় থাকে না। কখনো কখনো অন্ধকারের ভেতরেও কারও ভালো কাজের আলো লুকিয়ে থাকে।”
সেই থেকে শালবন গ্রামের মানুষ অমাবস্যার রাতে বটগাছের দিকে তাকিয়ে বলত—
Leave a Reply